MCJ NEWS

ডিজিটাল যুগে ঈদের ঘোষণা শুনি চাঁদ দেখা কমিটির ব্রেকিং নিউজে

পবিত্র রমজান মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা ও আত্মশুদ্ধির পর মুসলিমদের জীবনে আনন্দের বার্তা নিয়ে আর্বিভূত হয় পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে ভ্রাতৃত্বের মিলনমেলা আর সবার সঙ্গে খুশি ভাগাভাগি করে নেওয়া।ঈদ আনন্দের কথা বললেই কানে বেজে উঠে কাজী নজরুল ইসলামের সেই কালজয়ী গান- “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।”

শৈশবের ঈদ উদযাপন প্রত্যেক মানুষের কাছেই রঙিন স্মৃতি।তখন সকালবেলা গোসল করে নতুন জামা পরে দলবেধে ঈদগাহ মাঠে যাওয়া, বড়দের থেকে সালামি পাওয়া এবং আত্মীয়স্বজন কিংবা প্রতিবেশিদের বাড়িতে গিয়ে দাওয়াত খাওয়ার যে আনন্দ ছিলো তার তুলনা হয় না।

আধুনিক যুগে এসে এই চেনা আনন্দ যেন কিছুটা ফিকে হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে ঈদের নামাজ আর আলিঙ্গন শেষ হতে না হতেই অনেকে স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততায় এখন আর আগের মতো আত্মীয়স্বজন বা পাড়া-প্রতিবেশীদের বাড়ি গিয়ে খোজ নেওয়া হয় না। সময়ের ভিন্নতায় ঈদের অনেক প্রথা,অভ্যাস এমন কি আনন্দ যেমন বিলীন হয়েছে তেমনই তার শূন্যতাও পূরনে এসেছে ডিজিটাল ঈদ আনন্দ।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আইরিন আক্তার রিয়ার মতে সময়ের সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে পৃথিবীব্যাপী ঈদ উৎযাপনের ধরন। তিনি বলেন, “বর্তমানে ইদ আনন্দে এসেছে নতুনত্বের ছোঁয়া। ঈদের আনন্দ পরিবার- পরিজন, বন্ধু -বান্ধবের সাথে ভাগাভাগি করার জন্য কর্মব্যস্ত শহর থেকে সবাই শিকড়ের টানে গ্রামে ফিরে। সেকালে নাড়ির টানে ঘরে ফিরতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট কাটতে হতো। এখন ঘরে বসেই অনলাইনে মাধ্যমে সহজেই বাস, ট্রেন ও প্লেনের টিকেট কাটতে পারে। এতে কমেছে ভোগান্তি ও সময় সাশ্রয় হচ্ছে। এছাড়াও যারা প্রবাসী তারা ভিডিও কলের মাধ্যমে পরিবারের সাথে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারছে। পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ অপর প্রান্তের মানুষের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। আর এটি শুধু সম্ভব হয়েছে ডিজিটাল যুগের কারণে।”

“বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ”—আধুনিক যুগে ঈদ আনন্দ প্রসঙ্গে এভাবেই মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিরাজুল হাসান আপন। তিনি বলেন, “একসময় ঈদ মৌসুমে শিশু-কিশোররা নানা ডিজাইনের ঈদ কার্ড সংগ্রহ করত এবং বন্ধুদের মাঝে বিতরণ করে আনন্দ ভাগাভাগি করত। এসব কার্ডে প্রেরকের নিজের লেখা ছোট ছোট ছন্দও থাকত।যেমন: “আকাশেতে উড়ে যায় সাদা সাদা বক, বকের গায়ে লেখা আছে ঈদ মুবারক।”

কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় এমন সোনালি অভ্যাস প্রায় হারিয়ে গেছে। এখন ঈদ শুভেচ্ছা অনেকটাই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে ইনবক্সে লেখা একটি ছোট্ট “ঈদ মুবারক” বার্তায়। আরও মনে পড়ে, ইদের আগের রাতে বিশাল আকাশের বুকে চাঁদ খুঁজে বেড়ানোর কথা। আকাশে চাঁদ খোঁজার যে উচ্ছ্বাস, মানুষের হট্টগোল আর শিশুদের আনন্দধ্বনি তা ছিল এক অনন্য অনুভূতি! ঈদের আগেই যেন আরেক ঈদ। কিন্তু এখন স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের যুগে এক ক্লিকেই জানা যায় আগামীকাল ঈদ কিনা, ফলে সেই জমায়েত আর আগের মতো দেখা যায় না।”

ছোটবেলায় ঈদ বলতে কাজিনদের সঙ্গে এক হয়ে রাত জেগে আড্ডা দেওয়া, হাতে মেহেদী পরা আর সালামি সংগ্রহ করাকেই বুঝতেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারিহা নিশাত। তিনি বলেন, “এখন ডিজিটাল যুগের ব্যস্ততায় ছোটবেলার সেই ঈদের আনন্দটা আগের মতো অনুভব করা যায় না। তবে প্রযুক্তির এই সময়েও এর কিছু ইতিবাচক দিক আছে। ডিজিটালাইজেশনের কারণে দূরে থাকা বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে ভিডিও কলের মাধ্যমে সহজেই ঈদের শুভেচ্ছা ও আনন্দ ভাগাভাগি করা যায়। এমনকি ঈদের চাঁদ ওঠার আগেই বিকাশে সালামি পাওয়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে সবার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।এটা যেমন আমাদের সকলের মধ্যে সৌহার্দ্য, ভাতৃত্ব এবং সুসম্পর্ক বজায় থাকে ঠিক সেই ভাবে আমাদের সম্পর্কগুলো সুস্থ থাকে।”

কে কার আগে চাঁদ দেখতে পারে এটাও ছিলো প্রতিযোগিতার বিষয়! ডিজিটাল যুগে চাঁদ দেখা কমিটির ঘোষণা শুনি ব্রেকিং নিউজে। আধুনিক যুগের ঈদ আনন্দ প্রসঙ্গে এই মন্তব্য করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, “ছোট বেলার আর বড় বেলার ঈদের সব থেকে বড় পার্থক‍্য হলো, আমরা বড় হয়ে গেছি। আধুনিক প্রযুক্তি আর আমাদের বয়স ঈদের আনন্দে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।শৈশবে ঈদের আগে মোটা কাগজে ঈদ মোবারক লিখতাম। তা কি এক রোমাঞ্চকর ব্যাপার ছিল। এ কাজেও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। বাহারি ঈদ কার্ড,শুভেচ্ছা পোস্টার অনলাইনে এসেছে। সেগুলো চালাচালি হয় ইনবক্সে। লৌকিকতা, সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড ঈদ আনন্দ কে খানিকটা যন্ত্র বন্দী করে রেখেছে।এখন স্বশরীরে ঈদের দাওয়াত দেওয়াটাও কমে গেছে।”

অনেক সমালোচনার পরেও ডিজিটাল এই যুগ হরেকরকম ঈদ আনন্দের সুযোগ সৃষ্টি করেছে যেমন: সামাজিক যোগাযোগ মাধ‍্যমের বরাতে অনেক মানুষকে শুভেচ্ছা জানানো যায়, সালামি দেওয়া-নেওয়া যায়। সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট, কমেন্ট, লাইক, শেয়ার, অনলাইন শপিং বাড়তি আনন্দ দেয়। যেটা ছোটবেলার ঈদে ছিলো না।

এফকে/ কাজী সানজিদা কাঁকন

শেয়ার করুন -