
ভোরের আলো ফুটতেই একসময় যে বাতাস বুকভরে নেওয়া যেত, আজ সেখানে বিষাক্ত ধূলিকণার দাপট। জানালার বাইরে সবুজ পাতার নাচন কিংবা নদীর কাচের মতো স্বচ্ছ জল একসময় আমাদের যাপিত জীবনের গল্প বুনে দিত। তবে নগরায়ণ আর প্লাস্টিকের আগ্রাসনে তা এখন স্মৃতি। নির্বিচারে গাছ কাটা, বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যার মরো মরো অবস্থা আর কালো ধোঁয়ায় ধূসর হতে থাকা আকাশ মনে করিয়ে দেয়, আমরা ভালো নেই। প্রকৃতিকে রাগিয়ে মানুষ যে কখনোই শান্তিতে থাকতে পারে না, সেই রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েই আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬’।
সুইডেনের স্টকহোমে ১৯৭২ সালের ৫ জুন বসেছিল জাতিসংঘের ঐতিহাসিক ‘মানবিক পরিবেশ সম্মেলন’। বিশ্বনেতারা সেদিনই প্রথম এক সুরে মেনে নিয়েছিলেন যে, মানুষের অনিয়ন্ত্রিত বিলাসের মাশুল গুনছে এই ধরিত্রী। সেই সম্মেলনের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই আশির দশক পেরিয়ে আজ কাস্পিয়ান সাগরের তীরে, আজারবাইজানের বাকু শহরে এসে পৌঁছেছে এই আয়োজন। বিগত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই পথচলা আসলে উৎসবের ইতিহাস নয়; বরং এটি মানুষের মোহগ্রস্ত বিবেককে প্রতিনিয়ত প্রকৃতির বুকে ফিরিয়ে আনার আকুতি।
প্রতি বছরের মতো এবারও পরিবেশ রক্ষায় নতুন ও সময়োপযোগী প্রতিজ্ঞার বার্তা নিয়ে এসেছে এই বিশেষ দিনটি। ২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি নির্ধারিত মূল প্রতিপাদ্য —”জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সমাধান এবং স্থিতিস্থাপকতা।” এবারের আহ্বানটি কেবল প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ৫০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যাওয়া কার্বন নিঃসরণ কমানোতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আমাদের অর্থনীতি, জ্বালানি ব্যবস্থা ও প্রাত্যহিক জীবনধারাকে প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জরুরি বার্তা দিচ্ছে।
বিশ্বের জলবায়ু সংকটের মানচিত্রে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ কোনো দূরবর্তী নাম নয়, বরং বলা চলে যুদ্ধক্ষেত্র। এ বছরও গ্রীষ্মের রেকর্ডভাঙা দাবদাহে যখন জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে, কিংবা অতীতে উপকূলে যখন আইলা-সিডরের পর নতুন কোনো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় থাবা বসিয়েছে, তখন স্পষ্ট হয়েছে এই সংকটের গভীরতা। খুলনা বা সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানির আগ্রাসনে বিঘার পর বিঘা ফসলি জমি আজ মরুভূমি হতে চলেছে, যেখানে এক ফোঁটা মিষ্টি পানির জন্য নারীদের মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের উপকূলের একটি বড় অংশ স্থায়ীভাবে তলিয়ে গিয়ে লাখ লাখ মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে।
রাজধানী ঢাকার কথাই ধরা যাক, যেখানে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা বায়ুমানের সূচকে প্রায় সময় বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় ওপরের দিকে নাম ওঠে এই জাদুর শহরের। চারপাশের নদীগুলোর মরো মরো অবস্থা আর কালো ধোঁয়ায় ধূসর হতে থাকা আকাশ আমাদের প্রাত্যহিক স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিগত দশকটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের উষ্ণতম সময়, যার সরাসরি মাশুল গুনছে আমাদের কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতি। ভবিষ্যতে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য তীব্র খরা ও পানিসংকটের বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরো দেশ।
তবে এই ঘোর অমাবস্যার মাঝেও আশার আলো দেখাচ্ছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম, যাদের হাত ধরে গল্পটা বদলে যাওয়ার গান গায়। দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আজ আর শুধু পাঠ্যবইয়ের ‘পরিবেশ দূষণ’ অনুচ্ছেদে আটকে নেই। তারা নিজেদের পকেটের পয়সা বাঁচিয়ে ক্যাম্পাসে গড়ে তুলছে ছোট ছোট বনায়ন, নেমে পড়ছে নদীর ময়লা পরিষ্কারে কিংবা প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইকেল করে বানাচ্ছে নতুন সামগ্রী। বিশ্বজুড়ে জলবায়ু সুবিচারের যে লড়াই চলছে, তার প্রতিধ্বনি এখন বাংলাদেশের তরুণদের কণ্ঠেও, কারণ তারা বুঝতে পেরেছে পৃথিবীকে রক্ষা করা মানে অন্য কোনো পরোপকার নয়, বরং নিজেদের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায়।
পরিবেশ দিবস নিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বর্ধন কমিটির আহ্বায়ক ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সোহরাব বলেন, “পরিবেশ এবং মানুষের সম্পর্ক হচ্ছে প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণিজগতের মতোই একটা পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক। কেননা একমাত্র প্রকৃতির জীববৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য টিকে থাকলেই কেবল ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব টিকে থাকা সম্ভব হবে।
এজন্য পরিবেশ সংরক্ষণে মানুষকে সর্বপ্রথম পণ্যের প্রতি মিতব্যয়ীতা হতে হবে অর্থাৎ যে কোন জিনিস রিসাইকেলিংয়ের মাধ্যমে বার বার ব্যাবহার করতে হবে। পাশাপাশি প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পাটজাত পণ্য ব্যবহারের প্রতি ও গাছ লাগানোর জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। “
পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিশাল ধাক্কা সামলাতে বড় বড় নীতিমালার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ছোট ছোট অভ্যাসের পরিবর্তনও পরিবেশ সংরক্ষণে দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিদিন বাজার থেকে যে পলিথিন ব্যাগটি আমরা অবহেলায় নিয়ে আসি, তা শত বছরেও মাটিতে মেশে না; তাই পাটের বা কাপড়ের ব্যাগের ব্যবহার ফিরিয়ে আনা এখন প্রকৃতির অধিকারের দাবি।
উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু তা যদি হয় প্রকৃতিকে হত্যা করে, তবে সেই বহুতল ভবনের নিচে একদিন চাপা পড়বে আমাদের আগামীর প্রজন্ম। সুতরাং আধুনিকতার নামে যদি আমাদের সবুজ পৃথিবী ধ্বংস হতে থাকে, তবে সেই উন্নয়নই একদিন মানব সভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর বিশ্ব পরিবেশ দিবস আসে আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে জাগ্রত করতে। যা আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতি ও পরিবেশ বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখা আমাদের জন্য কতটা জরুরি। তাই সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায় পরিকল্পিত উদ্যোগ এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল পরিবেশ সংরক্ষণ ও নিরাপদ পৃথিবী নির্মাণ করা সম্ভব।
কেইউএইচ/ নুসরাত জাহান অনু
